
কলকাতা, ৭ মে : পরিকল্পনামাফিক ঠান্ডা মাথায় খুন করা হয়েছে চন্দ্রনাথ রথকে। বুধবার রাতে মধ্যমগ্রামের হাসপাতাল থেকে এমনটাই দাবি করলেন শুভেন্দু অধিকারী। তিনি জানান, মৃতের পরিবারের ও আহতদের চিকিৎসার যাবতীয় দায়িত্ব নেবে দল। শুভেন্দু অধিকারীর আপ্তসহায়ক চন্দ্রনাথ রথকে গুলি করে খুন করেছে দুষ্কৃতীরা। বুধবার রাতে মধ্যমগ্রামের দোহাড়িয়ায় বাইকে করে এসে তাঁর গাড়ি লক্ষ্য করে এলোপাথাড়ি গুলি চালায় দুষ্কৃতীরা। গাড়িতে চন্দ্রনাথের সঙ্গে আর একজন ছিলেন, যিনি গাড়ি চালাচ্ছিলেন। তাঁর নাম বুদ্ধদেব বেরা। তাঁদের দু’জনকেই উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে গেলে, চিকিৎসকেরা চন্দ্রনাথকে মৃত ঘোষণা করেন। বুদ্ধদেবকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় কলকাতার ইএম বাইপাস সংলগ্ন একটি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। রাত ১টার পর ঘটনাস্থলে পৌঁছোন রাজ্য পুলিশের ডিজি সিদ্ধনাথ গুপ্ত। তিনি জানিয়েছেন, তদন্ত চলছে। ডিজিপি বলেন, "আমরা মামলাটির তদন্ত শুরু করেছি। অপরাধে ব্যবহৃত চার চাকার গাড়িটি আমরা বাজেয়াপ্ত করেছি, কিন্তু জানা যাচ্ছে গাড়িটির নম্বর প্লেটটি নকল এবং তাতে কারসাজি করা হয়েছে। আমরা ঘটনাস্থল থেকে তাজা গুলি এবং ব্যবহৃত কার্তুজ উদ্ধার করেছি। প্রত্যক্ষদর্শী ও সাক্ষ্যপ্রমাণ খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং আরও তদন্ত চলছে।" একজন প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, "চন্দ্রনাথের গাড়িটা যেইমাত্র আমার গাড়িকে অতিক্রম করছিল, সেটি হঠাৎ মাঝপথে থেমে যায় এবং বাইকে করে একজন এসে গাড়িটির বাম পাশে গুলি চালাতে শুরু করে। লোকটিকে দক্ষ বলে মনে হচ্ছিল, সে সঙ্গে সঙ্গে পালিয়ে যায়। মনে হচ্ছিল এটা পূর্বপরিকল্পিত ছিল। গুলিগুলো খুব কাছ থেকে চালানো হয়েছিল। আমি ২টি গুলির শব্দ শুনেছি। এই ঘটনাটি রাত সাড়ে ১০টা থেকে ১১টার মধ্যে ঘটে। ঘটনাটি হাসপাতাল থেকে ২০০-৩০০ মিটার দূরে ঘটেছে। লোকজন আহতকে হাসপাতালে নিয়ে আসে এবং গাড়ির চালকও গুলিবিদ্ধ হন।"
খবর পেয়ে হাসপাতালে যান শুভেন্দু অধিকারী ও ডঃ সুকান্ত মজুমদার। শুভেন্দুর দাবি, “১৫ বছর ধরে রাজ্যে প্রতিহিংসার রাজনীতি চলেছে।" এই পরিস্থিতিতে দলীয় কর্মীদের শান্ত থাকার বার্তা দিয়েছেন শুভেন্দু অধিকারী। শুভেন্দু বলেন, "এটি একটি পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড এবং ডিজিপিও তাই বলেছেন। দুই-তিন দিন ধরে রেকি করা হয়েছিল এবং হত্যাকাণ্ডটি পুরোপুরি পরিকল্পিত ছিল। পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে। আমরা শোকাহত এবং এই ঘটনার নিন্দা জানানোর মতো ভাষা আমাদের নেই। দিল্লি থেকে আমাদের সমস্ত নেতৃত্ব এই বিষয়ে খবর পেয়েছে। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার নিহতের পরিবার এবং পুলিশের সঙ্গে কথা বলেছেন। বিভিন্ন নেতা এবং নির্বাচিত বিধায়করা তাঁদের নিজ নিজ অঞ্চল থেকে এখানে এসেছেন। পুলিশ কিছু প্রমাণ পেয়েছে এবং তারা তদন্ত করবে। এটা ১৫ বছরের মহা-জঙ্গল রাজের ফল। বিজেপি এখানে গুন্ডাদের নির্মূল করার কাজ শুরু করবে।"
এই খুনের ঘটনায় কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী ডঃ সুকান্ত মজুমদার বলেন, "এটি একটি মর্মান্তিক ঘটনা এবং পুলিশ বিষয়টি তদন্ত করছে। ডিজিপি আমাদের জানিয়েছেন, তদন্তে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রত্যেককে বিচারের আওতায় আনা হবে। রিপোর্ট অনুযায়ী পাঁচটি গুলি চালানো হয়েছে; আগে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হতে দিন। "আমাদের মুখ্যমন্ত্রী শপথ গ্রহণ করে সরকার ক্ষমতায় আসার সঙ্গে সঙ্গেই সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে—যদিও এতে কিছুটা সময় লাগতে পারে।"
বিজেপি নেত্রী অগ্নিমিত্র পাল বলেন, "ভবানীপুরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরাজয়েরই সম্ভবত এটি ফল। সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। চন্দ্র একজন বিশ্বস্ত ব্যক্তি ছিলেন; তিনি বিরোধী দলনেতার কার্যালয়ের সমস্ত কার্যক্রম তদারকি করতেন, আমাদের বিধায়কদের কাছে ভাইয়ের মতো ছিলেন এবং বিভিন্ন ছোটখাটো কাজও সামলাতেন। বিজেপির সঙ্গে যার বিন্দুমাত্র সম্পর্ক ছিল না, এমন একজন মানুষকে কেন খুন করা হলো? জনগণের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ রয়েছে। আমরা শান্তি চেয়েছিলাম, কিন্তু এখন পরিবার অবশ্যই এর জবাব চাইবে। কিছুক্ষণ আগেই আমাদের একজন বুথ কর্মী ছুরিকাহত হয়েছেন এবং বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।"
বিজেপি নেতা অর্জুন সিং বলেন, "অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এই হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা করেছে। তারা এই বার্তা দিতে চায় যে, আমরা ক্ষমতায় না থাকলেও তোমাদের চেয়ে আমরা এখনও অনেক বড় শক্তি। ওরা বোকা; ওরা এর জবাব পাবে।" বিজেপি নেতা সজল ঘোষ বলেন, "ওর কোনও শত্রু ছিল না এবং ও ছিল একজন হাসিখুশি ছেলে। শুধু শুভেন্দুর জন্য কাজ করত বলেই ওর এই পরিণতি হল। এটাই বাংলা। ৫টি গুলি করা হয়েছে। আমি সকাল থেকেই আমার কর্মীদের বাঁচানোর চেষ্টা করছি।"
এই ঘটনা প্রসঙ্গে বৃহস্পতিবার সকালে বিজেপি নেতা দিলীপ ঘোষ বলেন, "তাঁর (বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারীর) আপ্তসহায়কের ওপর হামলা চালানো হয়েছে। এই ঘটনাগুলো অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। বিজেপি ক্ষমতায় এসেছে, কিন্তু ক্ষমতা এখনও আমাদের হাতে আসেনি। পুলিশের ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। সমাজ-বিরোধী শক্তিগুলোকে থামাতে হবে। তৃণমূলের বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে লড়াই চলছে এবং বিজেপি কর্মীরা নিপীড়িত হচ্ছেন।"
