
দূরন্ত বার্তা ডিজিটাল ডেস্ক:আগামী ৩১ জানুয়ারি অবসর নিচ্ছেন তিনি। তার আগেই রাজ্যের পুলিশবাহিনী ও তাদের পরিবারের উদ্দেশে আবেগঘন অথচ দৃঢ় বার্তা দিলেন ‘ভারপ্রাপ্ত’ বা ‘অস্থায়ী’ ডিজি রাজীব কুমার। বৃহস্পতিবার আলিপুর বডিগার্ড লাইনে অনুষ্ঠিত ফেয়ারওয়েল প্যারেডে রাজ্য পুলিশ ও কলকাতা পুলিশের ভূয়সী প্রশংসা করেন তিনি। পুলিশের প্রকৃত কর্তব্য কী, দায়িত্ব পালনের সময় কোন মূল্যবোধ অটুট রাখা জরুরি এবং সমাজ পুলিশের কাছ থেকে কী প্রত্যাশা করে—সবকিছুই স্পষ্ট ও অনুপ্রেরণামূলক ভাষায় তুলে ধরেন বিদায়ী ডিজি। তাঁর বক্তব্যে ছিল আত্মবিশ্বাস, নৈতিকতার ডাক এবং কর্তব্যবোধের প্রতি অবিচল থাকার বার্তা।
রাজ্যে পুলিশের উদ্দেশে রাজীব বলেন, ‘‘পুলিশবাহিনীর প্রথম গুণ হল সাহস। অনেক সময় আমাদের অনেক কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। অনেক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়। সেই পরিস্থিতিতে আমরা যদি সৎসাহস দেখাতে পারি তা হলে সব চ্যালেঞ্জ নিতে পারব।’’ যে সাহসের কথা তিনি উল্লেখ করেছেন, তার একটা ব্যাখ্যাও দিয়েছেন ‘ভারপ্রাপ্ত’ ডিজি। তাঁর কথায়, ‘‘রুখে দাঁড়ানো। নিজের সিদ্ধান্তে অবিচল থাকা, সাহস মানে এটাই।’’
এই রাজ্যের ভৌগোলিক অবস্থানের জন্যও পুলিশকে যে অনেক কঠিন চ্যালেঞ্জ এবং পরিস্থিতির মুখে পড়তে হয়, সে কথাও স্মরণ করিয়েছেন রাজীব। তিনি জানান, তিনটি দেশের সঙ্গে সীমান্ত রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের। নেপাল, ভুটান এবং বাংলাদেশ। ফলে ওই দেশগুলিতে কোনও কিছু হলেই তার প্রভাব এসে পড়ে পশ্চিমবঙ্গে। এ ছাড়াও উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলিতেও যদি কোনও কিছু ঘটে, তার আঁচও এসে পড়ে এ রাজ্যে। তাঁর কথায়, ‘‘মোস্ট স্ট্র্যাটেজিক্যালি এবং জিও-পলিটিক্যালি (ইমপর্ট্যান্ট) স্টেট পশ্চিমবঙ্গ। ভারতের কোনও স্টেট নেই যেখানে তিনটি দেশের সীমান্ত রয়েছে।’’
কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েও রাজ্য এবং কলকাতা পুলিশ কর্তব্যে অবিচল থেকে যে ভাবে কাজ করে, তার জন্য গর্ব হওয়া উচিত হলে মনে করেন রাজীব। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সুষ্ঠু ভাবে বজায় রাখা হোক কিংবা সমাজের প্রতি কর্তব্য— সব দিক থেকেই এ রাজ্যের পুলিশ শ্রেয় বলে মত তাঁর। রাজীব বলেন, ‘‘কথা বলার থেকে কাজ বড়। ইউ আর ওয়ান অব দ্য বেস্ট পুলিশ ফোর্সেস ইন কান্ট্রি। কথা নয়, কাজ দিয়ে এটা বজায় রাখতে হয়।’’
রাজ্য পুলিশ কী ভাবে মাওবাদী সমস্যা মোকাবিলা করেছেন, সেই প্রসঙ্গ তুলে বাহিনীর প্রশংসা করেন রাজীব। পুজো হোক বা গঙ্গাসাগরের মতো উৎসব— এই সব কিছু যে ভাবে আইনশৃঙ্খলা বজায় রেখে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে পুলিশ, তা অত্যন্ত গর্বের বিষয় বলে মনে করেন তিনি। রাজীবের কথায়, ‘‘অনেক জায়গায় প্রাণহানির মতো ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু আমাদের পুলিশবাহিনী যে ভাবে এই সব উৎসব নিয়ন্ত্রণ করে, তার জন্য আমরা গর্বিত।’’ সবশেষে তিনি জানান, পুলিশের শীর্ষ আধিকারিকদের যতটা অবদান রয়েছে, ঠিক ততটাই অবদান রয়েছে হোমগার্ড, সিভিকদের। তাঁর কথায়, ‘‘আমরা একটা পরিবার। আমাদের শক্তি একসঙ্গে থাকার কারণে।’’
ডিজি নিয়ে সম্প্রতি একটা টানাপড়েন শুরু হয়েছে। রাজ্য পুলিশে বর্তমানে কোনও স্থায়ী ডিজি নেই। ‘ভারপ্রাপ্ত’ বা ‘অস্থায়ী’ ডিজি হিসাবে দায়িত্ব সামলাচ্ছেন রাজীব। আগামী ৩১ জানুয়ারি তাঁর অবসর নেওয়ার কথা। সম্প্রতি নবান্ন যে পুলিশকর্তাদের নাম ওই পদের জন্য কেন্দ্রকে পাঠিয়েছে, তাতে রাজীবের নামও রয়েছে।
নিয়ম অনুযায়ী, পুলিশের ডিজি পদে নিয়োগের জন্য সিনিয়র আইপিএস অফিসারদের নামের তালিকা রাজ্য সরকারকে পাঠাতে হয় ইউনিয়ন পাবলিক সার্ভিস কমিশন (ইউপিএসসি)-এর কাছে। সেখান থেকে তিন জনের নাম আসে রাজ্যের কাছে। তাঁদের মধ্যে এক জনকে পরবর্তী ডিজি হিসাবে বেছে নেয় রাজ্য সরকার। সরকারের পাঠানো তালিকায় ভারপ্রাপ্ত ডিজি রাজীব, মামলাকারী আইপিএস রাজেশের পাশাপাশি নাম রয়েছে ছয় সিনিয়র আইপিএস রণবীর কুমার, দেবাশিস রায়, অনুজ শর্মা, জগমোহন, এন রমেশ বাবু এবং সিদ্ধিনাথ গুপ্তের। প্রসঙ্গত, রাজ্য পুলিশের শেষ স্থায়ী ডিজি ছিলেন মনোজ মালবীয়। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে অবসর নেন তিনি। ডিজি নিয়োগের বিধি অনুযায়ী, মালবীয় অবসরের সময়ে যে আট জন রাজ্য পুলিশের সিনিয়র আইপিএস ছিলেন, তাঁদের নামই পাঠানো হয়েছে প্রস্তাবিত তালিকায়। সেই তালিকায় বর্তমান ভারপ্রাপ্ত ডিজি রাজীবও পড়েন। তাই তাঁর নামও পাঠাতে হয়েছে রাজ্য সরকারকে।
স্থায়ী ডিজি নিয়োগের জন্য আগেও প্রস্তাবিত নামের তালিকা পাঠিয়েছিল রাজ্য। কিন্তু আইনি জটিলতায় সেই নিয়োগ হয়নি। ইউপিএসসি-র বক্তব্য, পূর্ববর্তী স্থায়ী ডিজি অবসর নেওয়ার অন্তত তিন মাস আগে পাঠাতে হত প্রস্তাবিত নামের প্যানেল। অর্থাৎ, ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ওই তালিকা পাঠাতে হত। কিন্তু রাজ্য প্রস্তাবিত নামের প্যানেল পাঠিয়েছিল ওই বছরের ২৭ ডিসেম্বর। সম্প্রতি সেই প্যানেল ফেরত চলে আসে।
