
দূরন্ত বার্তা ডিজিটাল ডেস্ক: রাজ্যের যুব সম্প্রদায়ের জন্য আরও এক নতুন সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পের ঘোষণা করল পশ্চিমবঙ্গ সরকার। বৃহস্পতিবার বিধানসভায় রাজ্য বাজেট পেশ করতে গিয়ে অর্থমন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য জানালেন, মাধ্যমিক পাশ করেছেন অথচ কর্মসংস্থান হয়নি এমন যুবক-যুবতীদের জন্য চালু হচ্ছে নতুন প্রকল্প ‘বাংলার যুবসাথী’।এই প্রকল্পের আওতায় নির্দিষ্ট বয়সসীমার মধ্যে থাকা যোগ্য যুবক-যুবতীরা মাসে মাসে ১,৫০০ টাকা করে আর্থিক সহায়তা পাবেন। রাজ্য সরকারের দাবি, কর্মসংস্থানের সুযোগ না পাওয়া যুব সমাজকে আর্থিকভাবে স্বস্তি দিতেই এই উদ্যোগ।
বাজেট ভাষণে অর্থমন্ত্রী জানান, ২০২৬ সালের ১৫ অগস্ট থেকে এই প্রকল্প কার্যকর হবে। রাজ্যের যে সমস্ত যুবক-যুবতী মাধ্যমিক পাশ করেছেন এবং বয়স ২১ বছর পূর্ণ হয়েছে, তাঁরাই এই প্রকল্পের সুবিধা পাওয়ার যোগ্য হবেন। সর্বোচ্চ বয়সসীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ৪০ বছর। অর্থাৎ ২১ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে থাকা যুবক-যুবতীরাই ‘বাংলার যুবসাথী’ প্রকল্পের আওতায় আসবেন। তবে এই ভাতা চিরস্থায়ী নয়। সর্বাধিক পাঁচ বছর পর্যন্ত এই আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। এই সময়ের মধ্যে কেউ চাকরি পেয়ে গেলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাঁর নাম প্রকল্পের তালিকা থেকে বাদ যাবে। বাজেটে স্পষ্ট করে জানানো হয়েছে, যাঁরা মাধ্যমিক পাশ করেছেন অথচ এখনও চাকরি পাননি, তাঁদের কথা মাথায় রেখেই এই প্রকল্পের রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে। রাজ্য সরকারের তরফে ইতিমধ্যেই উচ্চশিক্ষার জন্য একাধিক স্কলারশিপ বা বৃত্তি চালু রয়েছে। যাঁরা সেই বৃত্তিগুলি পান, তাঁরাও ‘বাংলার যুবসাথী’ প্রকল্পের সুবিধা পাবেন বলে জানানো হয়েছে। অর্থাৎ শুধুমাত্র পড়াশোনার সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে কেউ এই ভাতা থেকে বঞ্চিত হবেন না।
রাজ্য সরকারের হিসেব অনুযায়ী, এই প্রকল্প চালু করতে ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। বাজেট নথিতে উল্লেখ রয়েছে, রাজ্যের বেকার যুবসমাজের আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এই ব্যয় প্রয়োজনীয় এবং তা রাজ্যের সামগ্রিক সামাজিক উন্নয়নের অংশ হিসেবেই দেখা হচ্ছে। সরকারের বক্তব্য, কর্মসংস্থান তৈরি করাই মূল লক্ষ্য, তবে যত দিন না সেই সুযোগ মিলছে, তত দিন যুবকদের পাশে দাঁড়ানোই এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, এই নতুন প্রকল্পের সঙ্গে রাজ্যের পুরনো ‘যুবশ্রী’ প্রকল্পের একটি মিল রয়েছে। বর্তমানে রাজ্যে ‘যুবশ্রী’ প্রকল্পের মাধ্যমে অষ্টম শ্রেণি উত্তীর্ণ এবং ১৮ বছর বয়স হলেই এমপ্লয়মেন্ট ব্যাঙ্কে নাম নথিভুক্ত করা যায়। তার পরে যোগ্য বেকার যুবক-যুবতীরা মাসে ১,৫০০ টাকা করে ভাতা পান। তবে চাকরি পেলে বা ৪৫ বছর বয়স হয়ে গেলে যুবশ্রী প্রকল্প থেকে নাম বাদ যায়। নতুন ‘বাংলার যুবসাথী’ প্রকল্পে বয়সসীমা ও শিক্ষাগত যোগ্যতা আলাদা হলেও বেকার যুবকদের আর্থিক সহায়তার লক্ষ্য একই রকম।
এই বাজেটটি রাজনৈতিক দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল। কারণ আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের আগে এটাই রাজ্য সরকারের শেষ পূর্ণাঙ্গ বাজেট। সেই কারণেই সামাজিক সুরক্ষা ও জনকল্যাণমূলক প্রকল্পগুলির উপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। যুবকদের জন্য নতুন প্রকল্প ঘোষণার পাশাপাশি রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের জন্যও সুখবর দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। বাজেটে মহার্ঘ ভাতা আরও চার শতাংশ বাড়ানোর ঘোষণা করা হয়েছে, যা রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের দাবির আংশিক প্রতিফলন বলে মনে করা হচ্ছে।
আশাকর্মীদের ভাতা এক ধাক্কায় ১,০০০ টাকা বাড়ানো হয়েছে। একই সঙ্গে অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী ও অঙ্গনওয়াড়ি সহায়কদের ভাতাও ১,০০০ টাকা করে বৃদ্ধি করা হয়েছে। রাজ্য সরকারের দাবি, সমাজের প্রান্তিক স্তরে কাজ করা এই কর্মীদের আর্থিক স্বীকৃতি ও সম্মান জানাতেই এই সিদ্ধান্ত। বাজেটে আরও একটি বড় ঘোষণা এসেছে ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’ প্রকল্প নিয়ে। এই জনপ্রিয় প্রকল্পে নতুন ও পুরনো—সব উপভোক্তার ক্ষেত্রেই ভাতা বৃদ্ধি করা হয়েছে। এত দিন যাঁরা মাসে ১,০০০ টাকা করে পেতেন, তাঁরা এবার থেকে পাবেন ১,৫০০ টাকা। পাশাপাশি তফসিলি জাতি, জনজাতি এবং অন্যান্য পিছিয়ে পড়া শ্রেণির মহিলারা এত দিন ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’ প্রকল্পে মাসে ১,২০০ টাকা পেতেন। ফেব্রুয়ারি মাস থেকেই তাঁদের ভাতা বেড়ে দাঁড়াবে ১,৭০০ টাকায়।
সব মিলিয়ে রাজ্য বাজেটে যুবক-যুবতী থেকে শুরু করে সরকারি কর্মচারী, স্বাস্থ্যকর্মী ও মহিলাদের জন্য একাধিক আর্থিক সহায়তার ঘোষণা করা হয়েছে। ‘বাংলার যুবসাথী’ প্রকল্পের মাধ্যমে বেকার যুবসমাজের পাশে দাঁড়ানোর বার্তা দিতে চেয়েছে রাজ্য সরকার। এখন দেখার, এই প্রকল্প বাস্তবে কতটা কার্যকর হয় এবং রাজ্যের যুবসমাজের ভবিষ্যৎ গঠনে কতটা ভূমিকা নিতে পারে।
