
দূরন্ত বার্তা ডিজিটাল ডেস্ক: ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের নির্ঘণ্ট ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে রাজ্য প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনার সূচনা হয়েছে। রবিবার গভীর রাতে রাজ্যের একাধিক শীর্ষ আমলা ও পুলিশ কর্মকর্তাকে হঠাৎ বদলির সিদ্ধান্ত নেয়ার পর নবান্নের রাজনৈতিক মহলে সরগরম পরিস্থিতি তৈরি হয়। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরাসরি মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার -কে চিঠি লিখে এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে তীব্র আপত্তি জানিয়েছেন। চিঠির শেষে তিনি কমিশনারকে ‘শুভেচ্ছা’ জানিয়ে সৌজন্য বজায় রাখার ইঙ্গিত দিয়েছেন, যা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের নজর কেড়েছে।
চিঠিতে মুখ্যমন্ত্রী অভিযোগ করেছেন, নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষণার অব্যবহিত পরেই কমিশনের যে নির্দেশিকা জারি হয়েছে, তা রাজ্যের প্রশাসনিক কাঠামোকে কার্যত নাড়িয়ে দিয়েছে। তাঁর বক্তব্য, মুখ্যসচিব, স্বরাষ্ট্র দফতরের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা এবং রাজ্য পুলিশের সর্বোচ্চ পদ—ডিরেক্টর জেনারেল অফ পুলিশ (ডিজি)-সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদে একযোগে বদলির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে রাজ্য সরকারের সঙ্গে কোনও পূর্ব আলোচনা বা মতামত নেওয়া হয়নি বলে তিনি চিঠিতে উল্লেখ করেছেন। মুখ্যমন্ত্রী চিঠিতে লিখেছেন, নির্বাচনের সময় কমিশনের সাংবিধানিক ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও এত বড় প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে দীর্ঘ দিনের প্রথা বা ‘কনভেনশন’ অনুসরণ করা হয়ে থাকে। অতীতে নির্বাচন চলাকালীন গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা কর্মকর্তাকে সরাতে হলে কমিশন সাধারণত রাজ্য সরকারের কাছে তিনজনের একটি প্যানেল চেয়ে সেই তালিকা থেকে একজনকে নির্বাচন করত। তবে এবার সেই প্রচলিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। রাজ্যের কাছে কোনো প্যানেল চাওয়া হয়নি, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ বা অসদাচরণের প্রসঙ্গও উল্লেখ করা হয়নি। মুখ্যমন্ত্রী এই একতরফা পদক্ষেপকে ‘স্বৈরাচারী’ সিদ্ধান্ত বলে অভিহিত করেছেন।
চিঠিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, ভারতের সংবিধানের ৩২৪ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নির্বাচন পরিচালনার পূর্ণ দায়িত্ব কমিশনের ওপর রয়েছে। ১৯৫০ ও ১৯৫১ সালের জনপ্রতিনিধিত্ব আইনেও নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় কমিশনের কর্তৃত্বের কথা স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে। কিন্তু সেই সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রেও কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে একটি প্রশাসনিক সৌজন্য বজায় রাখা হয়। মুখ্যমন্ত্রী মনে করেন, এই সৌজন্যই দেশের সহযোগিতামূলক যুক্তরাষ্ট্র কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা এবার উপেক্ষিত হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী আরও লিখেছেন, বিধানসভা নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধানদের এমনভাবে সরিয়ে দেওয়া নজিরবিহীন। এতে প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা বিঘ্নিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। নবান্ন সূত্রে জানা যায়, অতীতের নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ পদে যখনই বদলি হয়েছে, রাজ্যের সঙ্গে আলোচনা করা হতো। সেই প্রথা অনুসরণ না করায় তিনি প্রশ্ন তুলেছেন। চিঠির এক অংশে মমতা নির্বাচন কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচন কমিশনের দীর্ঘ দিনের গৌরবময় ঐতিহ্য রয়েছে, যার মূল ভিত্তি হল স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সততা। একতরফা পদক্ষেপ সেই ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্ণ করতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেছেন।
মুখ্যমন্ত্রী কমিশনের কাছে অনুরোধ করেছেন, ভবিষ্যতে এমন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে রাজ্য সরকারের সঙ্গে আলোচনা করা হোক। এতে প্রশাসনিক ভারসাম্য বজায় থাকবে এবং নির্বাচন পরিচালনার ক্ষেত্রেও স্বচ্ছতা ও আস্থা আরও দৃঢ় হবে। নবান্ন সূত্রের দাবি, নির্বাচনের প্রাক্কালে প্রশাসনের শীর্ষ স্তরে হঠাৎ এই ধরনের রদবদল চলমান প্রশাসনিক কাজ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং নির্বাচনী প্রস্তুতিতে প্রভাব ফেলতে পারে। রাজনৈতিক মহলে ইতিমধ্যেই এই চিঠি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। শাসকদল কমিশনের এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করছে, তবে বিরোধী শিবির মনে করছে, কমিশনের পদক্ষেপ নির্বাচনের অবাধ ও নিরপেক্ষ পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য সাংবিধানিক অধিকারভিত্তিক। প্রশাসনিক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, রাজ্য সরকার ও নির্বাচন কমিশনের এই টানাপড়েন আগামী দিনে আরও বড় রাজনৈতিক বিতর্কের রূপ নিতে পারে।
এছাড়া, চিঠির একেবারে শেষে মমতার লেখা ‘অল দ্য বেস্ট’ শব্দটি প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক মহলে নানা ধরনের ব্যাখ্যার জন্ম দিয়েছে। অনেকে মনে করছেন, এটি একটি রাজনৈতিক নিখুঁত সৌজন্যসূচক বার্তা, আবার কেউ কেউ এটিকে কমিশনের প্রতি মার্জিত সতর্কতা হিসেবে দেখছেন। সব মিলিয়ে, নির্বাচন ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে নবান্ন ও কমিশনের এই টানাপড়েন রাজ্য রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে, যা আগামী বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে আলোচনার বিষয় হয়ে থাকবে।
