
দূরন্ত বার্তা ডিজিটাল ডেস্ক: ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে রাজ্য পুলিশের শীর্ষ পর্যায়ে হঠাৎ রদবদলের নির্দেশ দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। এক ধাক্কায় রাজ্যের এক ডজন পুলিশ সুপারকে বদলি করা হয়েছে। কলকাতার ডিসি (সেন্ট্রাল) পদ থেকেও সরানো হয়েছে ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়কে। কমিশনের এই পদক্ষেপ রাজ্য প্রশাসন ও রাজনৈতিক মহলে সরগরম আলোচনা সৃষ্টি করেছে।
এর আগেই সোমবার নির্বাচন কমিশন রাজ্য পুলিশের ডিজি পীযূষ পাণ্ডেকে বদলির নির্দেশ দিয়েছিল। একই সঙ্গে কলকাতার পুলিশ কমিশনারকেও নতুন দায়িত্ব দেওয়া হয়। তবে সেই ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই কমিশন নতুন রদবদলের নির্দেশনা জারি করে। কলকাতার ডিসি (সেন্ট্রাল) ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়ের স্থলাভিষিক্ত করা হয় ইয়েলওয়াড় শ্রীকান্ত জগন্নাথরাওকে। রাজ্যের ১২টি জেলায় পুলিশ সুপারকেও নতুনভাবে বদলানো হয়েছে। এই তালিকায় রয়েছে বীরভূম, ডায়মন্ড হারবার, পূর্ব মেদিনীপুর, কোচবিহার এবং মালদহসহ অন্যান্য জেলা। বীরভূমের নতুন পুলিশ সুপার হিসেবে নিযুক্ত করা হয়েছে আইপিএস ২০১১ ব্যাচের সূর্যপ্রতাপ যাদবকে। কোচবিহারের এসপি হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে আইপিএস ২০১৬ ব্যাচের জসপ্রীত সিংহকে। বারাসত জেলার নতুন এসপি হয়েছেন আইপিএস ২০১২ ব্যাচের পুষ্পা।
ডায়মন্ড হারবারের পুলিশ জেলার সুপার বিশপ সরকারকে সরিয়ে ঈশানী পালকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। মুর্শিদাবাদ পুলিশ জেলার এসপি ধৃতিমান সরকারকে সরিয়ে তাঁর স্থলাভিষিক্ত করা হয়েছে আইপিএস ২০১৩ ব্যাচের সচিনকে। বসিরহাটের পুলিশ সুপার আরিশ বিলালকে সরানো হয়েছে এবং তাঁর স্থলাভিষিক্ত হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে অলকানন্দা ভোয়ালকে, যিনি আইপিএস ২০১৭ ব্যাচের। মালদহ জেলার পুলিশ সুপার প্রদীপকুমার যাদবকে সরিয়ে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে অনুপম সিংহকে। পূর্ব মেদিনীপুরের এসপি পারিজাত বিশ্বাসকেও বদলি করা হয়েছে। দিন কয়েক আগে তিনি ওই জেলার দায়িত্ব পেয়েছিলেন। এবার পূর্ব মেদিনীপুরে নতুন পুলিশ সুপার নিযুক্ত হয়েছেন আইপিএস ২০১২ ব্যাচের অংশুমান সাহা। এই হঠাৎ রদবদল রাজ্যের প্রশাসনিক কর্মপদ্ধতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। নির্বাচন কমিশনের এই পদক্ষেপ রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করেছে। নির্বাচনের প্রাক্কালে পুলিশের শীর্ষ পর্যায়ে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
এ ছাড়াও জঙ্গিপুর এবং পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার এসপি-ও বদলাল কমিশন। পশ্চিম মেদিনীপুরের পুলিশ সুপার পলাশ ঢালিকে সরিয়ে পাপিয়া সুলতানাকে দায়িত্ব দেওয়া হল। তিনি ২০১৫ সালের ব্যাচের পদোন্নতি পাওয়া আইপিএস। জঙ্গিপুরের এসপি হোসেন মেহেদি রহমানকে সরিয়ে দায়িত্বে আনা হল সুরিন্দর সিংহকে। তিনি আইপিএস ২০১৬ সালের ব্যাচ। পুলিশ সুপারদের সঙ্গে সঙ্গে দুই জন এডিজি-রও হঠাৎ বদলির সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। দক্ষিণবঙ্গের নতুন এডিজি হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন আইপিএস ১৯৯৭ ব্যাচের রাজেশকুমার সিংহ। উত্তরবঙ্গের এডিজি পদে নিয়োগ পেয়েছেন একই ব্যাচের কে জয়ারামন। পাশাপাশি চারটি গুরুত্বপূর্ণ পুলিশ কমিশনারেটেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। আসানসোল-দুর্গাপুর কমিশনারেটের নতুন সিপি হয়েছেন প্রণব কুমার। হাওড়া পুলিশ কমিশনারেটের নতুন এসপি দায়িত্ব নিয়েছেন অখিলেশ চতুর্বেদী। ব্যারাকপুর এবং চন্দননগর কমিশনারেটের নতুন এসপি হিসেবে নিযুক্ত হয়েছেন যথাক্রমে অমিতকুমার সিংহ এবং সুশীলকুমার যাদব।
রাজ্য প্রশাসন ও পুলিশ স্তরে এই হঠাৎ বদলিকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যেই নতুন বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। সোমবার রাতে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে চিঠি লিখে এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে আপত্তি জানিয়েছেন। চিঠিতে তিনি অভিযোগ করেছেন, রাজ্য সরকারের সঙ্গে কোনও পূর্ব আলোচনা বা মতামত না-নিয়ে এমন গুরুত্বপূর্ণ পদে বদলির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তিনি আরও উল্লেখ করেছেন, অতীতের নির্বাচনকালে গুরুত্বপূর্ণ পদে অফিসার বদল করতে চাইলে কমিশন সাধারণত রাজ্য সরকারের কাছে তিনজনের একটি প্যানেল চেয়ে সেই তালিকা থেকে একজনকে নির্বাচন করত। কিন্তু এবার সেই প্রথা পুরোপুরি উপেক্ষিত হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী চিঠিতে কমিশনের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে রাজ্য সরকারের সঙ্গে আলোচনা করা হোক এবং দীর্ঘদিনের প্রথা অনুসরণ করা হোক। তবে জানা গেছে, জ্ঞানেশের কাছে চিঠি পৌঁছার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কমিশন এই নতুন বদলির নির্দেশ জারি করেছে, যা প্রশাসনিক এবং রাজনৈতিক মহলে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
সব মিলিয়ে, নির্বাচনের প্রাক্কালে রাজ্য পুলিশের শীর্ষ পর্যায়ের এই হঠাৎ রদবদল রাজ্যের প্রশাসন এবং রাজনীতিতে নতুন উত্তেজনা তৈরি করেছে, যা নির্বাচনের আগে বহুল আলোচনা এবং বিশ্লেষণের বিষয় হয়ে উঠেছে।
