
দূরন্ত বার্তা ডিজিটাল ডেস্ক: দীপাবলি মানেই আলোর উৎসব। অমাবস্যার অন্ধকার দূর করে ঘরে ঘরে জ্বলে ওঠে প্রদীপের শিখা। বাড়ির দোরগোড়া থেকে ঠাকুরঘর, ছাদ থেকে বারান্দা—সর্বত্র আলো ছড়িয়ে দেয় মাটির প্রদীপ। কিন্তু এই আলোর উৎসবের নেপথ্যে যাঁদের অক্লান্ত পরিশ্রম, সেই মৃৎশিল্পীদের জীবনে ছবিটা সব সময় এত উজ্জ্বল নয়। বছরের পর বছর ধরে বংশপরম্পরায় মাটির প্রদীপ তৈরি করে আসা শিল্পীদের কাছে দীপাবলির মরসুম শুধু উৎসবের সময় নয়, বরং সারা বছরের রোজগারের অন্যতম বড় ভরসা। অথচ আধুনিক আলোকসজ্জার রমরমা, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি এবং সীমিত মুনাফার কারণে ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে তাঁদের জীবন-জীবিকা।
দীপাবলির কয়েক মাস আগে থেকেই মৃৎশিল্পীদের ঘরে শুরু হয়ে যায় ব্যস্ততা। কেউ মাটি সংগ্রহ করেন, কেউ চাকায় ঘুরিয়ে তৈরি করেন প্রদীপ, আবার কেউ সেগুলি শুকিয়ে আগুনে পোড়ানো এবং রং করার কাজে ব্যস্ত থাকেন। পরিবারের ছোট-বড় সদস্যরা মিলেই সামলান এই বিশাল কর্মযজ্ঞ। উৎসবের আগে বাজারে চাহিদা বাড়বে, বেশি প্রদীপ বিক্রি হবে—এই আশাতেই দিনরাত পরিশ্রম করেন তাঁরা। অনেক পরিবারের কাছে দীপাবলির এই কয়েক মাসের উপার্জনই পরবর্তী সময়ে সংসার চালানো, ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ মেটানোর গুরুত্বপূর্ণ অবলম্বন। কিন্তু কঠোর পরিশ্রম করলেই যে লাভের মুখ দেখা যায়, তা নয়। মাটি, জ্বালানি, রং এবং পরিবহণের খরচ মেটানোর পর হাতে সামান্য টাকাই থাকে অনেক শিল্পীর। তার উপর রয়েছে প্রদীপ তৈরি থেকে শুরু করে পোড়ানো পর্যন্ত নানা ঝুঁকি। আগুনে পোড়ানোর সময় অসংখ্য প্রদীপ ফেটে নষ্ট হয়ে যেতে পারে। কখনও আবার আবহাওয়ার প্রতিকূলতায় ঠিকমতো শুকোয় না কাঁচা প্রদীপ। ফলে উৎপাদনের পুরো প্রক্রিয়াতেই আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা থেকে যায়। যে প্রদীপ তৈরিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পরিশ্রম করতে হয়, সেটি নষ্ট হয়ে গেলে সেই শ্রমের মূল্য আর ফেরত পান না শিল্পীরা।
মৃৎশিল্পীদের সমস্যার আরেকটি বড় কারণ বাজারে সস্তা চিনা বৈদ্যুতিক আলো, রঙিন এলইডি এবং প্লাস্টিকের প্রদীপের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা। সহজে ব্যবহার করা যায়, বারবার কাজে লাগানো যায় এবং বিভিন্ন নকশায় পাওয়া যায়—এই সুবিধার কারণে অনেক ক্রেতাই আধুনিক আলোকসজ্জার দিকে ঝুঁকছেন। ফলে ঐতিহ্যবাহী মাটির প্রদীপের বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ছে। বিশেষ করে কম দামে তৈরি বৈদ্যুতিক আলো ও প্লাস্টিকের সামগ্রীর সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে সমস্যায় পড়ছেন ছোট শিল্পীরা। তাঁদের তৈরি প্রদীপ বিক্রি না হলে ঘরে জমে থাকে অবিক্রীত সামগ্রী। এতে একদিকে যেমন পুঁজি আটকে যায়, অন্যদিকে পরের বছরের উৎপাদন চালিয়ে যাওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে। তবে এখনও মাটির প্রদীপের আবেদন পুরোপুরি ফুরিয়ে যায়নি। বরং পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধি এবং দেশীয় শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার তাগিদে অনেক মানুষই দীপাবলিতে মাটির প্রদীপ ব্যবহারের উপর জোর দিচ্ছেন। মাটির প্রদীপ সহজে মাটির সঙ্গে মিশে যেতে পারে এবং প্লাস্টিকের মতো দীর্ঘস্থায়ী বর্জ্য তৈরি করে না। তাই পরিবেশবান্ধব দীপাবলি পালনের ভাবনা থেকে মাটির প্রদীপ কেনার প্রবণতা বাড়ানোর চেষ্টা করছেন বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠন। অনেক জায়গায় স্থানীয় শিল্পীদের কাছ থেকে সরাসরি প্রদীপ কেনার উদ্যোগও দেখা যায়।
মৃৎশিল্পীদের পাশে দাঁড়াতে ক্রেতাদের ছোট ছোট উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। উৎসবের কেনাকাটায় স্থানীয় শিল্পীদের তৈরি প্রদীপকে অগ্রাধিকার দেওয়া, ন্যায্য দাম দেওয়া এবং তাঁদের পণ্য সম্পর্কে অন্যদের উৎসাহিত করা—এসবের মাধ্যমে তাঁদের উপার্জনের সুযোগ বাড়ানো সম্ভব। পাশাপাশি স্থানীয় বাজারে মাটির প্রদীপের বিপণন, সরকারি সহায়তা, সহজ শর্তে ঋণ এবং শিল্পীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা গেলে এই ঐতিহ্যবাহী পেশাকে আরও শক্তিশালী করা যেতে পারে। দীপাবলির আলো শুধু ঘর সাজানোর জন্য নয়, সেই আলোয় বেঁচে থাকার স্বপ্নও জড়িয়ে থাকে হাজার হাজার মৃৎশিল্পীর। তাঁদের হাতের তৈরি ছোট্ট প্রদীপে যেমন জ্বলে ওঠে উৎসবের শিখা, তেমনই জড়িয়ে থাকে পরিশ্রম, ঐতিহ্য এবং পরিবারের ভবিষ্যতের আশা। তাই এ বার দীপাবলিতে মাটির প্রদীপ কেনা শুধু উৎসবের প্রস্তুতি নয়, স্থানীয় শিল্পীদের পাশে দাঁড়ানোরও একটি সুযোগ। আধুনিক আলোর সঙ্গে তাল মিলিয়েও যদি মাটির প্রদীপের ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখা যায়, তবেই আলোর উৎসবের আনন্দ পৌঁছবে সেই মানুষগুলির ঘরেও, যাঁদের হাতেই তৈরি হয় উৎসবের আলো।
