
দূরন্ত বার্তা ডিজিটাল ডেস্ক: শুভেন্দুর শপথ: দিল্লিতে মোদি, বাংলায় অধিকারী; শুরু ডবল ইঞ্জিন যুগ। ব্রিগেডের মেগা মঞ্চে আজ শুভেন্দু অধিকারীর শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান ছিল কার্যত শক্ত প্রদর্শনের মহড়া। উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ থেকে শুরু করে অসমের হিমন্ত বিশ্বশর্মা—বিজেপি শাসিত রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীদের ভিড়ে নজর কাড়ল শুভেন্দুর গেরুয়া বেশভূষা। শপথ নেওয়ার পর প্রধানমন্ত্রীর পা ছুঁয়ে আশীর্বাদ নেন তিনি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শুভেন্দুর এই ‘গেরুয়া অবতার’ আসলে প্রশাসনিক কড়াকড়ি এবং দুর্নীতিমুক্ত বাংলা গড়ার এক প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত।তাঁকে শপথবাক্য পাঠ করান রাজ্যপাল আর এন রবি।মন্ত্রিসভার সদস্য হিসাবে দিলীপ ঘোষ, অগ্নিমিত্রা পল, অশোক কীর্তনীয়া, নিশীথ প্রামাণিক এবং ক্ষুদিরাম টুডু শপথ গ্রহণ করেন। শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান উপলক্ষে বাঙালিয়ানার ছোঁয়ায় সেজে উঠেছে ব্রিগেড চত্বর। কীর্তন, ছৌ নাচ, বাউল গান, ধামসা-মাদলের তালে ভরে ওঠে ব্রিগেড। মঞ্চে রয়েছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছবি। সঙ্গে দক্ষিণেশ্বর, দুর্গার ছবির কোলাজ। জয় শ্রীরাম ধ্বনিতে মুখরিত ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ড।শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বহু ভিভিআইপি। মঞ্চে ছিলেন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের শেষযাত্রার সঙ্গী শিলিগুড়ির মাখনলাল সরকার। দিল্লিতে দেশাত্মবোধক গান গাওয়ার জন্য তাঁকে গ্রেপ্তার করে তৎকালীন কংগ্রেস সরকার। সেই মাখনলাল সরকারকে মঞ্চে সংবর্ধনা জানান মোদি। তাঁর পায়ে হাত দিয়ে প্রণামও করেন তিনি।শুভেন্দু অধিকারী রাজ্য রাজনীতিতে বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ মুখ। বাম আমলে নন্দীগ্রাম আন্দোলনের অন্যতম মুখ ছিলেন তিনিই। সিপিএমের গড় পূর্ব মেদিনীপুর জেলায় বিরোধীরা মাথা তুলে দাঁড়ায়। বাম সরকারের পতনের অন্যতম কারণ ছিল নন্দীগ্রাম আন্দোলন। সেকথা মেনে নেয় রাজনৈতিক মহল। ধারাবাহিক আন্দোলনের মধ্যে দিয়েই শুভেন্দু অধিকারী রাজ্য রাজনীতিতে জায়গা পোক্ত করেছিলেন। গত বিধানসভা নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নন্দীগ্রামের মাটিতে পরাস্ত করেছিলেন। এবার নন্দীগ্রামের পাশাপাশি ভবানীপুরেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কেন্দ্রে প্রার্থী হয়েছিলেন তিনি। ঘরেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে হারাবেন, সেই কথা জোর গলায় দাবি করেছিলেন শুভেন্দু। তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের পতন হয়। বিপুল জনসমর্থন নিয়ে ২০৭টি আসন জিতে বিজেপি রাজ্যে ক্ষমতায় প্রথমবার এসেছে। সেই ইতিহাসের কাণ্ডারীও শুভেন্দু, এমনই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।

ব্রিটিশ আমলে পূর্ব মেদিনীপুর থেকে ইংরেজদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে তাম্রলিপ্ত সরকার গঠিত হয়েছিল। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে মৃত্যুবরণ করেছিলেন বিপ্লবী দেশপ্রাণ শাঁসমল, মাতঙ্গিনী হাজরা। সেই আন্দোলনের মাটি থেকেই শুভেন্দু অধিকারী এবার বাংলার মুখ্যমন্ত্রী। শুভেন্দু অধিকারী একসময় নিজে একাধিকবার অভিযোগ করেছিলেন, তৃণমূল কংগ্রেসের সময়ে মুখ্যমন্ত্রী-সহ অন্যান্য মন্ত্রী সব কলকাতা ও আশপাশের এলাকা থেকে হত। গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীর পদ সবই কলকাতার বিজয়ী বিধায়করা পেতেন! জেলা বরাবরই উপেক্ষিত থাকত। জেলায় আন্দোলন করে ভোটে জিতে আসা বিধায়করা বরাবর থাকতেন পিছনের সারিতে। বড় জোর প্রতিমন্ত্রী করা হত! জেলা থেকে রাজ্য পরিচালনা হবে, সেই ইচ্ছাপ্রকাশ করেছিলেন শুভেন্দু। এবার সেই কথাই বাস্তবায়িত হল।
শনিবার ব্রিগেড ময়দানে শুভেন্দু-সহ ৬ মন্ত্রী শপথ নিলেন। শিশিরপুত্র মুখ্যমন্ত্রী হবেন তা শুক্রবারই জানা গিয়েছিল। আজ, শনিবার দিলীপদের নাম ঘোষণা করা হল। এই পাঁচজন কোন কোন দপ্তর পাচ্ছেন তা জানা যায়নি। মন্ত্রিসভার এই পাঁচ সদস্যের শপথকে যথেষ্ঠ গুরুত্ব দিয়ে দেখছে রাজনৈতিক মহল।
দিলীপ ঘোষকে বাংলায় বিজেপির উত্থানের কাণ্ডারি বললে ভুল বলা হয় না। দলকে ৩ থেকে ৭৭ করার পিছনে রয়েছেন তিনিই। অন্যতম সফল রাজ্য সভাপতি দিলীপ। তবে মাঝে দলের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব বাড়ে। সেই ঠান্ডা লড়াই দূরে সরিয়ে রেখে তিনি আজ, রাজ্যে বাংলার প্রথম বিজেপি সরকারের মন্ত্রী। দলকে লড়াইয়ের জায়গায় নিয়ে আসার পুরষ্কার পেলেন তিনি। এছাড়াও ‘দাবাং’ দিলীপ দীর্ঘদিনের আরএসএস কর্মী। সেই দিকেও বার্তা দেওয়া হল বলে মত একাংশের। সঙ্গে শপথ নিয়েছেন অগ্নিমিত্রা পলও। আসানসোল দক্ষিণ থেকে পরপর জিতে আসা অগ্নিমিত্রাকে মন্ত্রী করা হল। তিনি যে বিধানসভা এলাকার প্রতিনিধিত্ব করেন তা শিল্পাঞ্চল। সেই অঞ্চলকে বার্তা দেওয়ার পাশাপাশি মন্ত্রিসভায় ‘লড়াকু’ মহিলা মুখও আনল বিজেপি।
শুভেন্দুর মন্ত্রিসভায় জায়গা পেয়েছে বনগাঁ উত্তর থেকে জিতে আসা অশোক কীর্তনিয়া। মতুয়াদের গড় থেকে উঠে আসা অশোককে মন্ত্রী করে খুব স্বাভাবিকভাবেই মতুয়া ধর্মাবলম্বীদের পাশে থাকার বার্তা দেওয়া হয়েছে। তবে বনগাঁ ঠাকুর বাড়ি থেকে কাউকে এখনও মন্ত্রী ঘোষণা না করা কি ঠাকুর বাড়ি থেকে ক্ষমতা হস্তান্তরের ইঙ্গিত উঠছে সেই প্রশ্নও। প্রথম পাঁচে জায়গা পেয়েছেন অমিত শাহের ঘনিষ্ঠ রাজবংশী নিশীথ প্রমাণিকও। উত্তরবঙ্গ থেকে প্রতিনিধি তুলে ধরা হয়েছে। নির্বাচন ঢেলে ভোট দেওয়া জঙ্গলমহলকেও নিরাশ করেনি বিজেপি। কুড়মি সমাজ থেকে মন্ত্রী করা হয়েছে ক্ষুদিরাম টুডুকে। সাঁওতালি ভাষায় শপথ নিয়ে নিজের জাতির উন্নতির বার্তা দিয়েছেন তিনি।

আসলে ২০১১ সালের ওই ব্রিগেড সমাবেশের মঞ্চ থেকেই তৃণমূল ‘যুবা’ তৈরির ঘোষণা করেছিলেন মমতা। অনেকে বলেন, তৃণমূলের যুব সংগঠন থাকা সত্ত্বেও অভিষেকের জন্য ‘যুবা’ নামের সমান্তরাল সংগঠন তৈরির মূল উদ্দেশ্যই ছিল অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে রাজনীতির মূলস্রোতে আনা। তাঁর আগে অভিষেকের একটাই পরিচয় ছিল মমতার ভাইপো। এগারোর ওই ব্রিগেড সমাবেশ থেকে ‘যুবা’র প্রধান হিসাবে তাঁর নাম ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে আরও একটা জিনিসের সূত্রপাত হয়ে যায়। সেটা হল মমতা-শুভেন্দুর দূরত্ব। আসলে ওই সমাবেশের কিছুদিন পরেই শুভেন্দুকে সরিয়ে তৃণমূলের মূল যে যুব সংগঠন সেই যুব তৃণমূলের সভাপতি পদ থেকে শুভেন্দুকে সরিয়ে আনা হয় সৌমিত্র খাঁ-কে। সেই পর্বেই দলের অন্দরে প্রশ্ন উঠেছিল, যুব সংগঠন থাকার পরেও কেন সমান্তরাল আরও একটি সংগঠন? প্রশ্ন উঠছিল, দলের উঠতি জনপ্রিয় মুখ শুভেন্দুকে ক্ষমতার বৃত্ত থেকে সরাতেই কি যুবা আনা? পরে যুবর দায়িত্বও ঘুরপথে চলে যায় অভিষেকের হাতেই। আসলে সেটাই ছিল তৃণমূলের ক্ষমতা শুভেন্দুর হাতে তুলে দেওয়ার সূচনা। অন্তত পোড়খাওয়া রাজনীতিকদের তেমনটাই ধারনা।
তারপর পাঁচ বছর ধরে বাংলার সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন, বাংলায় হিন্দুত্বের জাগরণে অক্লান্ত পরিশ্রম করে গিয়েছেন শুভেন্দু। যার ফল মিলল ছাব্বিশে। তৃণমূলের অন্দরে এখন অভিষেককে নিয়ে কাটাছেড়া হচ্ছে, দলের নেতারা পর পর ‘সেনাপতি’কে গালমন্দ করছেন। এদিকে শুভেন্দুর রাজ্যাভিষেক হচ্ছে সেই ব্রিগেডের মঞ্চে। রাজনৈতিক মহল মনে করছে, আজ যে ব্রিগেডে শুভেন্দু মুখ্যমন্ত্রী হলেন, তার আসল লড়াইয়ের শুরুটা হয়েছিল ১৫ বছর আগের সেই ব্রিগেড সমাবেশ থেকেই। এ যেন এক আশ্চর্য সমাপতন।
