
দূরন্ত বার্তা ডিজিটাল ডেস্ক : ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর আজ কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে এক অভূতপূর্ব জনসমুদ্রের সাক্ষী থাকল পশ্চিমবঙ্গ। রাজনৈতিক সমীকরণের আমূল পরিবর্তনের পর পশ্চিমবঙ্গের নতুন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করলেন শুভেন্দু অধিকারী। রাজভবনের পরিবর্তে জনতাকে সাক্ষী রেখে ব্রিগেডের উন্মুক্ত মঞ্চে তাঁর এই শপথ গ্রহণ রাজ্যের প্রশাসনিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল।কবিগুরুকে প্রণাম করে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে কাজ শুরু করলেন তিনি। ঠাকুরবাড়িতে দাঁড়িয়ে তিনি জানান, সমালোচকদের চৈতন্য হোক। তবে তিনি এখন কারও সমালোচনা করতে চান না। বরং সামনের দিকে এগিয়ে যেতে চান। বর্তমানে তাঁর অনেক দায়িত্ব রয়েছে।
তাঁর কথায়, “ধুতি-পাঞ্জাবিতে থাকা ডঃ শ্যামপ্রসাদ মুখার্জির আদর্শের ভিত্তিতে যে দল তৈরি হয়েছে তার কোনও সার্টিফিকেট লাগে না। আমি মুখ্যমন্ত্রী, আমি এখন সকলের। যারা সমালোচনা করছেন তাঁদের চৈতন্য হোক।” পাশাপাশি তিনি আরও জানান, বাংলার অনেক ক্ষতি হয়েছ গিয়েছে। শিক্ষা হারিয়ে গিয়েছে, সংস্কৃতি ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। জোড়াসাঁকোতে দাঁড়িয়ে বাংলাকে নবনির্মাণ করার ডাক দেন শুভেন্দু। তিনি বলেন, “এখন অনেক দায়িত্ব রয়েছে। এখন একে অপরের সমালোচনার সময় নয়। যারা সমালোচনা করতে চাইছে করুক। আমরা এখন শুধু এগিয়ে যাব। চরৈবতি, চরৈবতি।”
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ইচ্ছাতেই রবীন্দ্রজয়ন্তীর দিন ব্রিগেটে শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় বলে জানান শুভেন্দু। তাঁর কথা মেনে শপথ নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে প্রথম সরকারি কর্মসূচিতে যোগদান করেন তিনি। কবিগুরুকে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করে তাঁর বার্তা, বাংলা ও বাঙালির চেতনা কবিগুরুর চেতনা ও ভাবনায় হবে।
গেরুয়া ঝড়ে ১৫ বছরের তৃণমূল সরকারের পতন হয়েছে। বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পরের দিনই তাৎপর্যপূর্ণভাবে ৯ মে রবীন্দ্র জয়ন্তীর দিন ব্রিগেডে মুখ্যমন্ত্রীর শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান হবে বলে ঘোষণা করা হয়। শুভেন্দু জানান, প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছাতেই শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানের জন্য এই দিনটাকে বেছে নেওয়া হয়। ব্রিগেডে মুখ্যমন্ত্রী ও অন্যান্য মন্ত্রীদের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান ছিল রবি-ময়। মুখ্যমন্ত্রী পদে শপথ নেওয়ার পর জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে উপস্থিত হয়ে প্রথম সরকারি কর্মসূচি সারেন শুভেন্দু। সেখানে কবিগুরুকে প্রণাম জানিয়ে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তিনি পথচলা শুরু করেন।

ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে সেই শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান (West Bengal CM 2026 Oath Ceremony) হয়েছে। সেই মঞ্চেই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি (Narendra Modi) পায়ে হাত দিয়ে এক বৃদ্ধকে প্রণাম করলেন। মাখনলাল সরকার (Makhanlal Sarkar) নামে ওই বৃদ্ধ তখন আবেগাপ্লুত। মোদিকে জড়িয়ে ধরেছেন তিনিও। ৯২ বছরের বৃদ্ধ মাখনলাল বিজেপির প্রতিষ্ঠাতা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের কাশ্মীর যাত্রার সঙ্গী ছিলেন। সেসময় জেলও খেটেছেন তিনি। শ্যামাপ্রসাদের স্মৃতিকে আগলে রেখে তিনিও বাংলায় বিজেপি সরকার গঠনের স্বপ্ন দীর্ঘদিন ধরে বুনেছেন। সেই স্বপ্ন বাস্তব হওয়ায় তাঁর চোখও জ্বলজ্বল করেছে। কিন্তু কে এই মাখনলাল সরকার?
বাংলায় মুখ্যমন্ত্রীর শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি-সহ বিজেপির প্রথম সারির নেতারা। উপস্থিত ছিলেন এনডিএ-শাসিত ২১ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীরা। ওই অনুষ্ঠানেই বিশেষ আমন্ত্রিত ছিলেন মাখনলাল সরকার। তিনি মঞ্চে উঠতেই বিজেপির নেতারা এগিয়ে যান। তাঁকে সম্মান জানান। নরেন্দ্র মোদি নিজে শাল, উত্তরীয় জড়িয়ে তাঁকে সম্মানিত করেন। ৯৮ বছরের বৃদ্ধের পা ছুয়ে প্রণাম করেন। আবেগে সেইসময় মোদিকে জড়িয়ে ধরেছেন তিনি।
ওই বৃদ্ধের বাড়ি উত্তরবঙ্গের শিলিগুড়িতে। শিলিগুড়ির ডাবগ্রাম সূর্যনগর এলাকায় ২৩ নম্বর ওয়ার্ডে তাঁর বাড়ি। বিজেপি প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই তাঁর রাজনীতিতে উপস্থিতি। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক সঙ্গী ছিলেন তিনি। স্বাধীনতা-পরবর্তী ভারতের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত প্রথম সারির তৃণমূল ব্যক্তিত্বদের মধ্যে অন্যতম মুখ। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর কাশ্মীর নিয়ে টানাপোড়েন, অশান্তি শুরু হয়। কাশ্মীরের পরিস্থিতি শান্ত করার জন্য ১৯৫২ সালে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় সেখানে গিয়েছিলেন। ভারতের জাতীয় পতাকা নিয়ে আন্দোলনে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন শ্যামাপ্রসাদ। সেই আন্দোলনের তাঁর সঙ্গী ছিলেন মাখনলাল সরকার। গ্রেপ্তারও হন।
শ্যামাপ্রসাদ জেলেই মৃত্যুবরণ করেছিলেন। জেলবন্দি থাকার পর ছাড়া পেয়েছিলেন মাখনলাল সরকার। বাংলায় ফিরে এসে শুরু হয়েছিল রাজনৈতিক আন্দোলন। ১৯৮০ সালে বিজেপি গঠিত হওয়ার পর, মাখনলাল সরকার দিনাজপুর, জলপাইগুড়ি এবং দার্জিলিং জেলার সাংগঠনিক সমন্বয়কারী হন। এক বছরের মধ্যেই তিনি প্রায় ১০ হাজার সদস্য নথিভুক্ত করেছিলেন। ১৯৮১ সাল থেকে তিনি একটানা সাত বছর জেলা সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। যা তৎকালীন দলের সাংগঠনিক কাঠামোতে একটি বিরল কৃতিত্ব হিসেবে বিবেচিত হত।
দেশের প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী উত্তরবঙ্গে গিয়ে তাঁর বাড়িতে গিয়েছিলেন। তাঁর সঙ্গেও মাখনলালের সম্পর্ক ছিল হৃদ্যতাপূর্ণ। এদিন ব্রিগেডে উপস্থিত হয়ে স্মৃতির আবেগে ভেসেছেন ৯৮ বছর বয়সী তরুণ।
